শেবাচিমে সিঁড়ির নিচেই চলছে চিকিৎসা

পেট ফোলা রোগ থেকে শুরু। গ্রামের ডাক্তারদের কাছ থেকে নিয়েছেন চিকিৎসা। এতে কোনো ফল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৫ বছর বয়সী সিদ্দিক খন্দকার। কিন্তু হাসপাতালে গিয়েই তাকে পড়তে হয় নতুন ভোগান্তিতে। জায়গা না পেয়ে হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ছয় দিন পরও শয্যা জোটেনি তার।

আগৈলঝাড়া উপজেলার খাজুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিক খন্দকার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, প্রথমে দালালের খপ্পরে পড়ে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অপ্রয়োজনীয় ও ভুয়া পরীক্ষা করাতে হয়েছে তাকে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে ইউরোলজিক্যাল সমস্যার কথা। পরে চিকিৎসকেরা তাকে অপারেশনের পরামর্শ দেন।

তিনি অভিযোগ করেন, ছয় দিন ধরে ক্যাথেটার পরানো আছে। ডাক্তার আসে যায়, কিন্তু অপারেশন কবে হবে তা জানান না। ডায়াবেটিস ও প্রেশার ঠিক আছে। সিদ্দিক খন্দকারের ভাষায়, তিনি যেন চিকিৎসা নিতে এসে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। সিঁড়ির নিচে শুয়ে থাকা, পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাব এবং অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে তার দিন কাটছে চরম কষ্টে।

একই চিত্র দেখা যায় বরিশালের উজিরপুরের জয়শ্রীর ভরষা কাঠি গ্রামের বাসিন্দা লিটন মোল্লার ক্ষেত্রেও। কিডনিতে পাথরের সমস্যায় পাঁচ দিন আগে ভর্তি হয়েছেন তিনি। তাকেও জায়গা দেওয়া হয়েছে সিঁড়ির নিচের এক কোণে। তার অভিযোগ, অপারেশনের কথা বলা হলেও কখন করা হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে না। সংকীর্ণ জায়গায় মানুষের চলাচল, নোংরা পরিবেশ এবং শৌচাগারের অপ্রতুলতা তার দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

শুধু সিদ্দিক খন্দকার বা লিটন মোল্লাই নয়, দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য রোগী বাধ্য হয়ে হাসপাতালের করিডর, বারান্দা এমনকি সিঁড়ির নিচেও শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শয্যা সংকটের কারণে ভোগান্তি চরমে উঠলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তারা সেখানেই অবস্থান করছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, কাগজে-কলমে এটি হাজার শয্যার হাসপাতাল হলেও বাস্তবে অবকাঠামো এখনো ৫০০ শয্যার। করোনাকালে জরুরিভিত্তিতে নির্মিত একটি ভবন পরে ওপিডি হিসেবে চালু করা হলেও সেখানেও শয্যা সীমিত। বর্তমানে সরকারি হিসেবে হাসপাতালটি ১২০০ শয্যার হলেও প্রতিদিন চিকিৎসাধীন থাকেন প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫ শত রোগী।

এই বিপুল রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের। ৫০০ শয্যার জন্য নির্ধারিত জনবল দিয়েই চলছে আড়াই হাজার রোগীর চিকিৎসা। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বরিশালের গবেষক আনিসুর রহমান খান স্বপন বলেছেন, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের শেষ ভরসা এই হাসপাতাল। প্রতিটি ওয়ার্ড ও করিডরে রোগীর ভিড় এতটাই বেশি যে চলাচলই কঠিন হয়ে পড়ে। গাইনী, শিশু, মেডিসিন, অর্থোপেডিক্স ও সার্জারি বিভাগে চাপ সবচেয়ে বেশি। তার মতে, চিকিৎসকদের সীমাবদ্ধতার চেয়ে বড় সমস্যা হলো জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা।

শিক্ষক দেবাশীষ চক্রবর্তীও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, সিসিইউর মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটেও পর্যাপ্ত পরিবেশ নেই। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে দমবন্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করে। শয্যার তুলনায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মশিউল মুনির জানান, ধারণক্ষমতার তুলনায় চার থেকে পাঁচগুণ বেশি রোগী এখানে ভর্তি থাকেন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ২৫০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। জায়গা সংকটের কারণে বারান্দা ও ওয়ার্ডের সামনেও রোগীদের রাখতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, চিকিৎসকের ২২৪টি পদের মধ্যে ৯২টি শূন্য। নার্সদের ক্ষেত্রেও প্রায় ৬২ শতাংশ পদ খালি রয়েছে। জনবল ও অবকাঠামো সংকটের বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে আধুনিক ও সক্ষম করে তুলতে না পারলে বরিশালের এই হাসপাতালের ওপর চাপ কমানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে রেফারেল ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি।

Comments (০)
Add Comment